ঐতিহ্য রক্ষার নেপথ্যের নায়ক – কাস্টোডিয়ান মুহাম্মদ ফজলুল করিম


ভোরের আলো তখন মাত্র দিগন্ত ছুঁয়েছে। শান্ত গ্রামের মানুষজনের ঘুম ভাঙছে ধীরে ধীরে, আর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টোডিয়ান মুহাম্মদ ফজলুল করিম তখন পা ফেলছেন হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রাঙ্গণে। দিনের শুরুটা যেন তার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়—শুরু হয় ইতিহাসকে আগলে রাখার এক অবিরাম শপথে।

বিশ্ব ঐতিহ্য পাহাড়পুর সোমপুর মহাবিহার—যার দেয়ালে লুকিয়ে আছে পাল যুগের শিল্প, স্থাপত্য আর ধর্মীয় মহিমা। আর এই বিশাল প্রত্নস্থলকে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সচল রাখেন যিনি—তিনি যেন এই স্থাপনার নেপথ্যের নায়ক।


প্রতিদিন সকালে ফজলুল করিম বিহারের শিশিরভেজা ঘাসে পা রেখে প্রথমেই ঘুরে দেখেন পুরো এলাকা। নিবিড় চোখে পর্যবেক্ষণ করেন প্রত্নস্থলের প্রতিটি অংশ। কোথাও ক্ষয় হয়েছে কি না, ভাঙা ইট খসে পড়েছে কি না, কিংবা রাতের আঁধারে কোনো অযাচিত ঘটনার চিহ্ন রয়েছে কি না—কোনো কিছুই তার চোখ এড়িয়ে যায় না। তার কাছে এই ধ্বংসাবশেষ শুধু কাগজের ফাইল নয়—এগুলো এক জীবন্ত ইতিহাস। তাইতো প্রতিদিনই নিবিড় পর্যবেক্ষণে ভালোবেসে আগলে রাখেন এই বিশ্ব ঐতিহ্যকে।”

 

সকাল বাড়তেই হাজির হন দর্শনার্থীরা—দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক, শিক্ষার্থী। তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রত্নস্থলের নিয়ম বোঝানো, ইতিহাস ব্যাখ্যা করা, কর্মীদের কাজ তদারকি করা—সবই ফজলুল করিম করেন হাসিমুখে। পর্যটকরা তাকে অবাক হয়ে আবিস্কার করেন, কাস্টোডিয়ান, গাইড, গবেষক ও অভিভাবক হিসেবে। অফিসের নিত্যদিনের কাজে বিহারের সংস্কারের প্রস্তুতি, বাজেট পরিকল্পনা, কর্মীদের কাজ, নিরাপত্তা টহল—সবই তার দায়িত্বের অংশ। আবার হঠাৎ করেই ছুটতে হয় বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী উদ্ধারের কাজে।

প্রায় প্রতিদিনই ঐতিহাসিক এই প্রত্নস্থল পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খাবার ও প্রয়োজন হলে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা—এসব করেন দক্ষ হাতে। এছাড়াও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভিন্ন সভা–সেমিনার, উদযাপন অনুষ্ঠান—সবকিছুতেই তার উপস্থিতি অপরিহার্য। প্রতিদিন তাকে ট্যুরিস্ট পুলিশিং কার্যক্রম, স্থানীয় জনগণ, সাংবাদিক, দর্শনার্থী, এনজিওসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সুষ্ঠু যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়।

সকাল থেকে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত—বিহারের কাজেই ব্যস্ত সময় কাটান তিনি। চারপাশে যখন নেমে আসে শান্ত অন্ধকার, তখনও ফজলুল করিমের দায়িত্ব শেষ হয় না। ঐতিহাসিক সোমপুর বিহারের বাগানে থাকা বন্য শেয়ালদের খাবার নিশ্চিত করেন তিনি। সার্বক্ষণিক সবকিছু নজরদারি রাখেন; কর্মীবাহিনী নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকে—প্রয়োজনে সব সময় সেবা দেয়ার।

তিনি বলেন, “এটা শুধু চাকরি নয়—এটা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার আনন্দটাই আলাদা।”



পাহাড়পুরের দায়িত্ব পাওয়ার আগে ফজলুল করিম দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাত বছর কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। পাহাড়পুরের আগে তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি, যশোরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িত জাদুঘরেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, আগারগাঁও, ঢাকায় সহকারী কাস্টোডিয়ান/গবেষণা সহকারী হিসেবে তার প্রথম যোগদান হয়েছিল।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতার এই পথচলা তাকে আজ ঐতিহাসিক পাহাড়পুরের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং গভীর ভালোবাসায় এগিয়ে এনেছে।  সহস্র বছরের পুরনো এই বৌদ্ধবিহার আজও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে— কারণ শুধু প্রত্নতত্ত্বের উদ্যোগ নয়, এমন অসংখ্য নীরব মানুষের শ্রম, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা এটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মুহাম্মদ ফজলুল করিম তাদেরই একজন।

ভোর থেকে রাত—তার ব্যস্ততা একটাই উদ্দেশ্যে, বিশ্ব ঐতিহ্যের এই মহামূল্যবান স্থাপনাটি যেন আগামীর প্রজন্মও ঠিক এভাবেই দেখতে পারে।


লেখক: 

আরমান হোসেন

জীবিকাহেতু