যার খবর কখনো সংবাদ হয় না—সংবাদের ফেরিওয়ালা ছাইদুল
ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই কিছু মানুষের দিন শুরু হয়ে যায়। তখনো রাস্তা ঘুমিয়ে থাকে, দোকানের শাটার নামানো, চারপাশে নিস্তব্ধতা। ঠিক সেই নীরবতার ভেতর ভেসে আসে পরিচিত এক ডাক— “আজকের পত্রিকা…”। এই ডাকের পেছনের মানুষটি জয়পুরহাটের সংবাদের ফেরিওয়ালা ছাইদুল ইসলাম আকন্দ। প্রতিদিন যিনি অন্যের খবর পৌঁছে দেন, অথচ তার নিজের গল্প কখনো সংবাদ হয়ে ওঠে না।
ছাইদুলের বয়স ৩২ বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি। জীবিকার তাগিদে ২০০৭ সাল থেকেই পত্রিকা বিলির কাজে যুক্ত তিনি। সময়ের সাথে সাথে এই পেশায় যুক্ত হন তার ছোট ভাই ছাইফুল। ২০১১ সালে ছাইফুল (২৮) এই কাজে যোগ দেন। এখন দুই ভাই মিলে জয়পুরহাটের কালাই, পুনট, মোলামগাড়ি, মাত্রাই, হাতিয়র ও বৈরাগীর হাট এলাকায় নিয়মিত পত্রিকা পৌঁছে দেন।
ছাইদুল জানান, তারা ঠিক অর্থে ফেরি করেন না। এলাকার বাসিন্দাদের চাহিদা অনুযায়ী পত্রিকা সরবরাহ করেন। কে কোন পত্রিকা পড়েন, কখন দিতে হবে—এসব তাদের মুখস্থ। অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর একই পত্রিকা পড়ছেন। তারা প্রতিদিন গড়ে ৩০০ জনের বেশি গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন।
তিনি আরো বলেন, অনেকেই এই কাজকে ছোট বলে কিন্তু এই কাজ তো আমি ভালোবাসি। লোকের সব কথা ভুলে যাই যখন সকাল বেলা পত্রিকা হাতে পাই।
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত পত্রিকা বিলির কাজ করেন ছাইদুল। এরপর বিকেলে বসেন তার পানের দোকানে। কারণ শুধু পত্রিকা বিলির আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তিনি বলেন,“টেনে–টুনে সংসার চলে। এই দুইটা কাজ মিলিয়েই কোনোমতে চলি।”
ছাইদুলের পরিবার পুরোপুরি তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তার একটি মেয়ে রয়েছে, সে বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ের পড়াশোনার খরচ, সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়—সবই আসে এই আয়ের ওপর ভর করে। মা–বাবার ভরণপোষণের দায়িত্বও আছে। সেই দায়িত্ব তিন ভাই মিলেই চালান।
এই পেশায় প্রতিদিনই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বৃষ্টি, কুয়াশা, প্রচণ্ড রোদ কিংবা ব্যস্ত সড়কের ঝুঁকি—সবকিছু সামলে সময়মতো পত্রিকা পৌঁছাতে হয়। কখনো কখনো রাস্তার দুর্ঘটনা, যানজট কিংবা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন ও অনলাইন মাধ্যমে খবর সহজলভ্য হওয়ায় কাগজের পত্রিকার পাঠক দিন দিন কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংবাদ হকারদের জীবিকায়। আগের মতো বিক্রি নেই, আয়ও কমেছে। তবুও নিয়ম করে প্রতিদিন বের হতে হয়, কারণ এই কাজই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
করোনাকাল ছিল ছাইদুলদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। দীর্ঘদিন পত্রিকা ছাপা ও বিতরণ বন্ধ থাকায় কার্যত কোনো আয় ছিল না। সেই সময় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন তারা। ধার-দেনা করে দিন পার করতে হয়েছে। তবুও হাল ছাড়েননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই আবার ফিরেছেন পরিচিত পথে—সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে।
এলাকার মানুষের কাছে ছাইদুল একজন পরিচিত মুখ। অনেকেই তাকে নাম ধরে ডাকেন। কেউ চা খাওয়ান, কেউ খোঁজখবর নেন। কারণ তিনি শুধু পত্রিকা বিলি করেন না—তিনি এলাকার নীরব সাক্ষী। স্থানীয় রাজনীতি, দুর্ঘটনা, সামাজিক ঘটনা, উৎসব কিংবা খেলাধুলা—সব খবর মানুষের হাতে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে তার নিরব অবদান।
সংবাদের শিরোনামে তার নাম আসে না, অথচ সেই মানুষের হাত ধরেই সংবাদ পৌঁছে যায় মানুষের দোরগোড়ায়—ছাইদুল তাদেরই একজন। প্রতিটি সকাল শুরু হয় তার মতো অসংখ্য সংবাদের ফেরিওয়ালার নিঃশব্দ পরিশ্রমে।
যার খবর কখনো সংবাদ হয় না, কিন্তু যাকে ছাড়া সংবাদ পৌঁছানোই অসম্ভব—তিনি সংবাদের ফেরিওয়ালা ছাইদুল।
-আরমান হোসেন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন