আলুর বাজারে অস্থিরতা, লোকসানের শঙ্কায় জয়পুরহাটের কৃষক

জয়পুরহাটে চলতি মৌসুমে আলুর বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় হাটে নতুন আলুর দাম কম থাকায় লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কি না—এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। আলু উত্তোলন পুরোপুরি শুরু না হলেও মৌসুমের শুরুতেই বাজারদরের এই চিত্র কৃষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।


কৃষক আফসার আলী জানান, “তিন বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। নিয়মিত পরিচর্যা করছি। আগেরবারও দাম পাইনি, এবারও তো মনে হয় দাম পাবো না। হাটে নতুন আলুর দাম কেজিতে ২০ টাকা। আলু তুলতে তুলতে কোন দামে গিয়ে ঠেকে বলা মুশকিল।” তিনি আরও বলেন, “আগের ফসলের টাকা দিয়ে এই ফসল হয় না। আমি একটা গরু বিক্রি করে আলু চাষের কাজ করছি। এবার যদি ভালো লাভ না হয়, তাহলে আলুর ওপর থেকে ভরসাই উঠে যাবে।”


আরেক কৃষক বলেন, “ক্ষতি মুখে পরলেও আশা করেই আমরা আলু চাষ করেছি। এখনও সবাই আলুই চাষ করে। আলু চাষে সময় কম লাগে, তাই অন্য ফসল মানুষ করছে না। আগে এই জমিতে আলুর সঙ্গে সরিষাও হতো, কিন্তু এখন আর কেউ করে না। সরিষা থেকে লাভ হয় ঠিকই, তবে ফসল ঘরে তুলতে সময় লাগে—তাই মানুষ আগ্রহ দেখায় না।”


কৃষক রাব্বী হাসান জানান, “বর্তমান ধানের যে দাম, সেই টাকা দিয়ে আলু চাষ করা যায় না। তাই ঋণ করে আলু চাষ করছে কৃষক। এবার আলুতে যে টাকা লেগেছে সেই টাকা তোলা খুব কঠিন হয়ে যাবে। আলুর যে বাজারদর, মনে হয় না এবার কৃষক বাঁচবে। আমি পাঁচ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি। খরচের টাকা তুলতে পারবো কি না জানি না। কেউ গরু বিক্রি করছে, অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছে। এই টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে মানুষ—এই চিন্তায় আমরা চরম হতাশ।”


এলাকাবাসীর দাবি শুধু উৎপাদন নয়—সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবই আলু চাষিদের বড় দুর্বলতা। জয়পুরহাট অঞ্চলে আলুভিত্তিক প্রসেস ফুড কারখানা—যেমন আলুর চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলু গুঁড়ার কারখানা স্থাপন করা হলে কৃষকরা সহজে ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে একদিকে আলুর অতিরিক্ত উৎপাদন সংরক্ষণ সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।


কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ হারুনুর রশিদ জানান, “প্রতি মৌসুমে একই সময়ে ব্যাপকহারে আলু উত্তোলনের ফলে বাজারে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেড়ে যায়, যার কারণে দাম কমে যায়। চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পিত উৎপাদন ও কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। তিনি আরও বলেন, এক ফসলের ওপর নির্ভরতার কারণেই কৃষকরা বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রবি মৌসুমে আলুর পাশাপাশি সরিষা, গম, ডাল ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসল চাষে গুরুত্ব দিতে হবে।


কৃষকদের বিকল্প ও লাভজনক ফসল চাষে উৎসাহ দিতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি আলু সংরক্ষণের জন্য নতুন কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণাগার স্থাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশ করা হয়েছে। ঋণ নিয়ে চাষ করা কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।”


কৃষকরা বলছেন, শুধু চাষে উদ্বুদ্ধ করা নয়—বাজার নিশ্চয়তা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নচেৎ প্রতিবছর আলু মৌসুম এলেই জয়পুরহাটের মাঠে মাঠে শোনা যাবে একই হতাশার গল্প।

 

-আরমান হোসেন