পত্রিকায় প্রকাশিত আমার দ্বিতীয় ছোট গল্প ‘উহির স্বপ্ন’
উহি ক্লাস নাইনে পড়ে মা-বাবা আর ভাই নিয়ে ওদের পরিবার। কষ্টে পরিবার চললেও বরাবরই উহি ক্লাসে প্রথম হয়। উহির ইচ্ছা বড় হয়ে শিক্ষিকা হবে সমাজের অশিক্ষা আর কুশিক্ষার অন্ধকার দূর করবে। কিন্তু পরিবারের যে অবস্থা....। যদি উপবৃত্তি আর বিনে পয়সায় বই না পাওয়া যেত তাহলে কোনদিন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেত তার ইয়াত্তা নেই। মেয়েটি অনেক পরিশ্রমী প্রাইভেট ছাড়ায় এগিয়েছে এই পর্যন্ত। অনেকবার এলাকার শফিক মাতবর বলেছে উহির বাবাকে ‘‘এতো পড়ায়ে কি হবে শেষে তো সেই হাড়ি পাতিলই....। অবশ্য একথা বলার একটা কারণ আছে; মাতবরের মেয়ে রিনি উহির ক্লাসেই পড়ে বরাবরই রিনি ক্লাসে দ্বিতীয় হয়। এখানেই মাতবরের মাথা ব্যাথা, তাই উঠে পড়ে লেগেছে উহির পড়াশুনা বন্ধ করতে। কিন্তু উহির মা-বাবা অশিক্ষিত হলেও তারা উপলব্ধি করতে পারে অশিক্ষিত থাকাও অপরাধ।
যখন সুযোগ আছে তখন সমস্যা কিসে? বেশতো চলে যাচ্ছে; তাতে হোকনা কষ্ট। উহির বাবা কৃষি কাজ করে আর মা বাড়িতে একটা ছোট্ট মুদি দোকান চালায়। পরিবার অনেক কষ্টে চললেও পরিবারের কোন সদস্যই উহিকে দোকানে কাজ করতে দেয় না। উহির ভাই ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে সংসারী কাজে মন দিয়েছে পড়াশুনায় তার আগ্রহ কম। এখন পরিবারের অন্যসব সদস্যদের মতো তার মনে প্রাণে চাওয়া একই স্বর্বস্ব দিয়ে উহির পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া। একদিনের কথা বরাবরের মতো উহি রান্না ঘরে মায়ের কাজে সাহায্য করছিল তখন উহির দিকে তাকিয়ে ওর মা বলে উঠে, এই তো সেদিন তোর জন্ম হলো আর দেখতে দেখতে কতো বড়ো হয়েছিস, আর কদিন পর তো পর হয়ে যাবি। কেন মা পর হবো কেন? উহির প্রশ্ন। কেন তোর বিয়ে দিতে হবে না উহির মায়ের উত্তর। ‘‘যাও তোমার সাথে কথা নাই” বলে উহি রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে ওর শোবার ঘরে। উহিকে বিয়ের কথা বললেই ওর মন খারাপ হয়ে যায় কারণ বিয়ে হয়ে গেলেই তো আর পড়তে পারবেনা সে, আর শিক্ষিকা হবার স্বপ্নটা তার স্বপ্নই রয়ে যাবে। শোবার ঘরে গিয়ে ডুকরে কাঁদছে মেয়েটা। রান্নাঘর থেকে উহির মা ডেকে যাচ্ছে, উহি, এই উহি, কই গেলি মা? এই যে তুই এখানে!
একি তুই কাঁদছিস কেন? আচ্ছা বাবা আমার ভুল হয়ে গেছে আর বিয়ের কথা বলব না। উহি বিছানা থেকে উঠে মাকে জড়িয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বলতে থাকে আমি তোমাদের ছেড়ে কোত্থাও যাবনা কোত্থাও না। আচ্ছা ঠিক আছে আমার পাগলিটা “আই লাভ উ’’। এবার উহি কান্না ছেড়ে একে বারে হাঁসতে-হাঁসতে গড়াগড়ি দিতে লাগল আর মুখে বলতে লাগল ‘‘আই লাভ উ’’ হা হা হাহ্ উহ্ উহ্ মা তুমি ও না পারো ও বটে। বাংলা সিনেমার গুনে উহির মা আই লাভ উ টুকু শিখেছেন অবশ্য অর্থটা বোঝেন তিনি। কিন্তু এর ব্যবহার সংরক্ষিত শুধু পরিবারের সদস্যদের জন্য। সব ঠিকই চলছিল কিন্তু মাতবর তো আর বসে নেই। গতকাল মাতবর এসে ধমকে গেছে উহির বাবাকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে যদি বন্দকী জমির টাকা না শোধ করা হয় তাহলে মাতবর জমির দখল নেবে। জমি থেকে যা একটু ফসল পাওয়া যেত তাতে খুব কষ্টে সংসার চলত আর এখন যদি সেইটাও হারাতে হয় তাহলে পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে। উহির বাবা সন্ধ্যায় মাতবরের বাড়ি গিয়ে অন্য রুপের মাতবরকে আবিস্কার করল।
মাতবরের ব্যবহার আমূলে পরিবর্তিত হয়েছে মাতবর উহির বাবাকে দেখে কাছে ডেকে বলা শুরু করল ‘‘মিয়া আমি জানি তুই আমার কাছে কি জন্য আসছিস তাই আমি যা বলি ভলো করে শোন আমার একটা শর্ত মানলে তোর জমি ফেরৎ পাবি তার সাথে সাথে আরো অনেক কিছুই পাবি। কি শর্ত? মাতবর উহির বাবার প্রশ্ন। মাতবর বলল: শর্তটা হলো আগামী ৭ দিনের মধ্যে তোর মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে। শর্ত শুনে মাথায় বাজ পড়ল উহির বাবার কোন কথা বের হলো না মুখ থেকে ধীরে ধীরে মাতবরের বাড়ি থেকে ভারাক্লান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে কথাটি উহির মাকে বলার সময় উহি কথাটি আড়াল থেকে শুনে ফেলে, কিন্তু এবার কাঁদল না সে আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসে মাকে জড়িয়ে উহি বলল আমি চাইনা মা আমার জন্য তোমাদের বিপদের মুখে ফেলতে, ‘‘আমি বিয়ে করব মা’’ শুধু তোমাদের জন্য উহির মা কান্না ধরে রাখতে পারলেন না মা-মেয়ে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না ওদের কারোরই কিন্তু পরিস্থিতি খুবই করুণ। এদিকে উহি ছেলে দেখার ক্ষেত্রে সবকিছু মা-বাবার হাতে ছেড়ে দিয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক অবশেষে বিয়ে হলো অনেক ধুমধাম করে। শর্ত মাফিক মাতবর এবার কথা রাখলেন। এ বিয়েতে সবচেয়ে খুশি ব্যক্তি হলেন মাতবর কারণটা সবারই জানা। উহির বিয়েতে শুধু ওর পরিবারই কাঁদল তা নয় প্রতিবেশীরা ও কেঁদেছে। উহির বিয়ে হলো মধ্যবিত্ত ঘরে মার্জিত ও সচ্ছল পরিবারে। উহির স্বামীর নাম উজ্জ্বল। উজ্জ্বল সরকারি চাকুরিজীবি। উজ্জ্বল আর উহির জুড়িটা যেমন সুন্দর হয়েছে তেমনি ওদের মনের মিল অনেক। উজ্জ্বল উহির মতোই মা-বাবার পছন্দেই বিয়ে করছে। স্বামী হিসেবে উজ্জ্বল যেমন সুন্দর উহিও তেমনি পবিত্র। উহির কাছ থেকে উজ্জ্বল সব কথা শুনেছে তাই উহিকে আবার পড়াশুনায় ফিরিয়ে আনল।
বন্ধুর মতো স্বামীর সহযোগিতায় জীবনে প্রথমবারের মতো সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিল সে সংসারে ব্যস্ত উহি এবার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করলো ১ম বিভাগে মাট্রিক পাশ করল। অন্য দিকে উহি চলে আসার পর ক্লাসে ১ম হওয়া রিমি স্বভাবতই ২য় বিভাগে পাশ করেছে। যাহোক পড়াশুনা চলছিল উহির একাদশ থেকে এরার সে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়াশুনা শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সময় চলে আসল এবার দ্বিতীয় বারের মতো সার্টিফিকেট পরীক্ষার। এবারো উহি ১ম বিভাগ নিয়ে পাশ করল। ৫ মাস পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ সার্কুলার হয় এতে উহি পরীক্ষা দেয় এবং সাফল্যের সাথে সে উর্ত্তীণ হয় আর পৌঁছে যায় তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে। আর এর পরের অংশটুকু অনেক সুখের বন্ধুর মতো স্বামী আর স্বপ্নের পূর্ণতা নিয়ে তাঁর জীবনটা এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নেরই মতো।
x

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন