সাপ্তাহিক শারদীয়াতে প্রকাশিত আমার তৃতীয় ছোট গল্প ‘‘দেউলিয়া’’


হঠাৎ চোখের উপর দুটো মোলায়েম হাতের বাঁধন পড়ায় চোখে কিছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু শুনতে পাচ্ছিলেন চিরচেনা কোমল স্বরের প্রশ্ন -আমি কে বলো তো দাদু?
খনিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পরক্ষণে উল্লসিত রমিজউদ্দিন পাল্টা প্রশ্ন করে- আরে রবি দাদু কখন এলে তুমি?
রবির বয়স বার। রবি রমিজউদ্দিনের বড়ছেলে রহমানের একমাত্র সন্তান । রবি বাবা-মার সাথে ঢাকাতে থাকে। ছুটিতে গ্রামে যখন আসে রবির তখন বেশিরভাগ সময় দাদুর সাথেই কাটায় । এতটুকুন ছেলে কিন্তু জানার আগ্রহ ওর প্রবল নতুন কিছু দেখলেই প্রশ্নের ঝুড়ি মেলে ধরে দাদুর সামনে..এটা কি? , এটা কেন? এটা কিভাবে হলো? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন।
রমিজউদ্দিন নাতিকে অনেক ভালবাসেন তাই বছরের এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকেন তিনি। রবি তো শুধূ তার নাতি নয় একাধারে খেলার সাথী, প্রতিযোগী, প্রতিপক্ষ সবই; তাই প্রতিযোগিতা চলে একে অন্যের মাঝে! এবার ররি ভেবেছিল দাদুকে হারিয়ে দেবে শুরু থেকেই কিন্তু আশানরুপ ফল না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
-দাদু তুমি আমাকে চিনলে কিভাবে?
-তোমার গায়ের গন্ধে চিনেছি দাদু। রমিজউদ্দিনের উত্তর।
রবি বুঝতে পারল কি ভুলটাই না করেছে সে! সব পরিকল্পনা টিকই ছিল শুধু দাদুর দেয়া সুগন্ধিটা না মাখলেই দাদুকে হারিয়ে দেয়া যেত। ভাবতে ভাবতে এতোক্ষণ বাদে চোখ ছেড়ে দিয়ে দাদু কোলে বসে পড়ল রবি।
গত ঈদে রমিজউদ্দিন রবিকে সুগন্ধি উপহার দিয়েছিল সেই সুগন্ধিটা দাদুর কথা মনে করে প্রতিদিন ব্যবহার করত সে আজও তার বিপরীত হয়নি।
নাতিকে আদর করতে করতে রমিজউদ্দিন বললেন,
-না না দাদুভাই আমাকে হারিয়ে দেবার জন্য কখোনই সুগন্ধি না মেখে কোথাও বাহিরে যাবে না।
রবি হতবাক হয়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল,
-দাদু তুমি কিভাবে জানলে আমি কি ভাবছি?
হাসতে হাসতে রমিজউদ্দিন রবির গাল টেনে দিয়ে বললেন,
-সে গল্প পরে বলছি তোমাকে কিন্তু তার আগে গোসল করে এসো, তুমি যে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে মা-বাবাকে রেখে মাঠের পথে কাদা মাখিয়ে এসেছ তা কি খেয়াল আছে???
একথা শুনে রবি নিজের দিকে একবার তাকায় দাদুর দিকে একবার তাকায়! রবি তো হতবাক! এ কেমন  আশ্চর্য কথা! আমি রাস্তায় গাড়ি থামালাম সেটা দাদু জানলো কিভাবে...!
-এতো আর্শ্চয হওয়ার তো কিছু নেই দাদু যাও; গোসল করে খাবার ঘরে গিয়ে লাল ঝাপিটা তুলে যা আছে সাবাড় করে এখানে এসো আমরা মাঠ দেখতে বেড়োব। রমিজউদ্দিন বললেন।
-ওকে দাদু। দাদু আর একটা প্র....? কি একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল রবি।
থামিয়ে দিয়ে রমিজউদ্দিন বললেন,
-তাড়াতাড়ি যাও, না হলে তোমার মায়ের বকা খাবে; এই ওরা এলো বলে??
বলতে না বলতেই দরজায় রবির বাবার কন্ঠ শুনতে পাওয়া গেল। এই শুনে ররি দাদুর ঘাড়ের গামছা নিয়ে দে দৌড়।
ইতোঃমধ্যে রবির বাবা-মা  এসে উপস্থিত হয়েছে। একটুর জন্য বেঁচে গেছে রবি। রবির বাবা-মা কদমবুছি করে রমিজউদ্দিনকে জিজ্ঞেস করে,
-কেমন আছেন আপনি? প্রতিউত্তরে হ্যা সূচক জবাব দিয়ে রবির বাবা-মাকে ঘরে গিয়ে আরাম করতে বলেন?
একমাত্র নাতি রবি ছাড়া কারোর সাথে তেমন বেশী কথা বলেন না রমিজউদ্দিন, এমনকি নিজের ছেলের সাথেও নয়।
রবির মা প্রশ্ন করে, বাবা রবি কই? প্রতিউত্তরে, রবি খাবার খাচ্ছে।
রবির মা রবিকে সবটা বুঝে উঠতে পারেন না গ্রামে আসলে। শহরের যে ছেলেকে তাগাদা না দিলে খায় না সে কি না এখানে এসেই খেতে বসে গেল! তাও আবার একা...?? এসব এলোমেলো চিন্তা করতে করতে ঘরে চলে গেল রবির মা।  মায়ের ঘরে যাওয়া দেখে রবির এসে উপস্থিত, দাদু অ্যাই য়্যাম ব্যাক...! এখন চল।
মাথা নাড়িয়ে রমিজউদ্দিন বললেন,
-না রে দুষ্টু ডিমটা খেয়ে আয় তারপর যাবো?
কোন কথা না বাড়িয়ে এক দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে মুখে ডিম পুরে দাদুর কাছে এসে বলল,-এবার ঠিক আছে?
হুম্ ঠিক আছে। এই যে নাও পানি খাও। হতবাক রবি যন্ত্র মানবের মতো পানি খেয়ে পলকহীন দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল। যতই দেখছে দাদুকে সে ততই অবাক হচ্ছে ।
রবির পানি খাওয়া শেষ হলে নাতিকে কোলে তুলে নিয়ে চলতে শুরু করল রমিজউদ্দিন। নিয়ম মাফিক নাতিকে নিয়ে মাঠে যাবেন তিনি। রবি যন্ত্রচালিত গাড়ির চেয়ে ওর দাদুর কোলেই বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করে। এই সময়টা তাই অনেক আনন্দের...। রবির তার স্বভাবসিদ্ধ প্রশ্নের ঝুড়ি থেকে অনবরত প্রশ্ন করছে। ততক্ষণে দাদু নাতি মাঠে গিয়ে উপস্থিত; রবি এবার বলে উঠল।
-আচ্ছা দাদু আমাদের গ্রামের নাম দেউলিয়া কেন?
মুচকি একটা হাসি দিয়ে রবির গালে একটা চুমু খেয়ে বললেন,
-মানে এখন গল্প শোনাতে হবে তাই তো?
হাসোজ্জ্বল মুখে মাথা নেড়ে রবির সম্মতি। রবির হাসি মাখা মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেবলই একটা রাজ্য জয় করেছে। রমিজউদ্দিন এবার গল্প বলা শুরু করলেন, অনেক অনেকদিন আগের কথা। তখন এ গ্রামের নাম ছিল শান্তিপুর। আমার বয়স পনের হবে। সামনের মাঠ দেখিয়ে রমিজউদ্দিন বললেন, -এই যে মাঠ দেখছো এই মাঠে তখন অনেক ফসল হতো। গ্রামের মানুষ সুখে শান্তিতে বাস করছিল এই বলে পরক্ষণে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রমিজউদ্দিন। রবিও দাদুর মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল যদিও দীর্ঘশ্বাসের কারণটা ওর অজানা। এবার আবার শুরু হলো গল্প। একবার আমাদের গ্রামে ভয়ানক বন্যা হয় ভেসে নিয়ে যায় বাড়ি-ঘর, ফসলী জমির ফসলসহ সবকিছু আমাদের বাড়ি উচু জায়গায় থাকায় আমাদের বাড়ির তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। গ্রামের সর্বত্র হাহাকার। সবাই নিঃস্ব, করোর বাঁচার কোন অবলম্বন নেই। সে যে কি কষ্টের সময় ছিল রে দাদু তুই যদি দেখতিস বলতে বলতে চোখের পানি মুছলেন রমিজউদ্দিন।
-তারপর দাদু, তারপর  কি হলো? আগ্রহভরে রবির জিজ্ঞাসা।
-সবাই আমাদের বাড়িতে এসে জমায়েত হলো আমাদের আঙিনায়।
-আমাদের আঙিনায় কেন দাদু? রবির প্রশ্ন।
আমার বাবা ইউসুফ উদ্দিন তখনকার অনেক সন্মানী মানুষ ছিল সবাই তাকে অনেক মান্য করত; সবাই জানত যে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় একমাত্র তাঁরই জানা। সবাই নিশ্চুপ বাড়ির আঙিনায় বসে। কিছুক্ষণ পর বাবা আঙিনায় আসলেন। জমায়েতের সবাই একটু নড়েচড়ে বসল।
বাবা কথা শুরু করলেন,
-ভাইসব আশাহত হইও না আল্লাহ আছেন। তোমরা কিসের চিন্তা করছ! আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের এই দেউলিয়া অবস্থা থাকবে না। যা হয়েছে ভুলে যাও আজ থেকে তোমরা আমার বাড়িতে থাকবে এখানেই  খাবে যা দরকার আমি দেব যেভাবেই হোক। যতদিন পর্যন্ত তোমাদের অবস্থার উত্তরণ না হয় আমি আমার সর্বস্ব উজার করে দিয়ে তোমাদের সাহায্য করে যাব। আজ তোমাদের একাত্বতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, এ সমস্যা তোমাদের ঐক্যের কাছে তুচ্ছ আমরা নতুন উদ্যেমে এগিয়ে যাবো। তাই বর্তমান পরিস্থিতি ও এ দৃষ্টান্তকে মনে রাখার জন্য শান্তিপুর গ্রামের নাম আজ থেকে “দেউলিয়া”।  আর সেই তখন থেকেই এ গ্রামের নাম দেউলিয়া বুঝলে দাদুভাই। রবির প্রশ্ন- আচ্ছা দাদু তুমি যে সবার কথা, কাজ ঠিক ঠিক বলে দিতে পারো সেটা কিভাবে।
রমিজউদ্দিন এবার রহস্যের হাসি হাসলেন আর বললেন, -সে না হয় অন্য আর একদিন শুনবে দাদু এখন চলো তোমার মা তোমার কথা ভাবছে।
http://www.sharodia.com/issue.php?y=2014&m=01&d=24