প্রতিশোধ

ভূতটা তখন বিকট কন্ঠে বলছে ‘‘তোর বাপের হাতে পায়ে ধরছিলাম তাও শুনল না, আমাকে ভূতচারা থেকে তাড়িয়ে দিলো কিইবা এমন করছিলাম আমি, একটা না হয় বাচ্চাই খাইছিলাম। আজ তোকে মেরে প্রতিশোধ নিবো প্রতিশোধ।”

-কিরে কই গেলি রে ভুট্টু।
মাঠ থেকে ফিরে ছোট ছেলেটা কে ডাক দিলো হাছির সোনার? হাছির সোনারের ৪ ছেলে ৫ মেয়ে। তাঁর মধ্যে ছোট্ট ছেলে ভুট্টুর বয়স এখন ১১-১২ হবে। সবার ছোট হওয়াই একটু বেশিই ভালোবাসে ওকে।

-কি আব্বা কিছু কবেন? বাবার ডাক শুনে দৌড়ে এসে ভুট্টু উত্তর দিল। 
-হ.. কতা ত্যামন কিছু না, আজ রাতে সজাগ থাকিস বিলে মাছ মারতে যামু।
-আচ্চা ঠিক আচে আব্বা। ভুট্টুর উত্তর।

রাত ১১টা: -ভুট্টু এই ভুট্টু ওঠ ওঠ। ফিসফিসিয়ে ছেলেকে জানালায় গিয়ে ডাকলেন হাছির সোনার।
কাউকে না জানিয়ে মধ্যরাতে মাছ ধরতে যাওয়া বাবা-ছেলে নিত্যকার অভ্যাস।

ডাক শুনে ভুট্টু কাঁধে জাল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো নিত্যকার মত। ততক্ষণে হাছির সোনার খলই হাতে বিলের দিকে হাঁটা দিয়েছে। আজ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠা হয়ে গিয়েছে তাই বুঝি চোখ থেকে ঘুম ছাড়ছেনা এমন মনে হচ্ছে ভুট্টুর । তার মধ্যে ওর বাবা আজ কেমন জানি আগেই হাঁটা দিয়েছে, অন্যরাতে পরিকল্পনা করত মাঠে গিয়ে ওরা কিভাবে কি করবে; আজ কেন জানি...। এলোমেলো ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছে ও, ততক্ষণে বিলের কাছে পৌঁছে  গেছে ওর বাবা। বাবার তাড়াহুড়োতে আজ অবাক ভুট্টু। একপ্রকার দৌড়ই দিলো ভুট্টু বাবার সাথ ধরার জন্য; কিন্তু কয়েকবার চেষ্টার পরও ব্যর্থ হলো সে। কোনো ভাবেই বাবার সাথে আসতে পারছিল না। ভুট্টু ভাবল সে তো জাল নিয়ে আছে তাই সে না উপস্থিত হলে মাছ ধরাই হবে না এই ভেবে ধীরেই যেতে থাকে ঠিক তখনই গর্জে ওঠে হাসির সোনার
-কিরে ব্যাটা তাড়াতাড়ি আয়।

বাবার ডাক শুনে পড়ি মরি করে খাড়া আইল দিয়ে যেতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল ভুট্ট কোন মতেই উঠতে পারছে না সে। হাতে হঠাৎ একটা শীতল টান অনুভূব করে ভুট্ট;ু কে যেন হেচকাঁ টান মেরে তুলছে ওকে। দাড়িয়ে চোখ ছানা বড়া হয়ে যায় ভুট্টুর সে দেখে ওর বাবা ওকে হাত ধরে টেনে তুলছে কিন্তু বাবা তো অনেক দূরে ছিল...। যাহোক এবার আবার পথ চলা শুরু হলো কিছুক্ষণ হাঁটার পর মাছ ধরার জন্য নির্দ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাল দুুজন। বাবার মেজাজের কথা ভেবে কথা না বাড়িয়ে ভুট্টু জাল ফেলার প্রস্তুতি নিলো; জাল গোছানো শেষ এবার জাল পানিতে ছোড়ার পালা..কিন্তু পেছনে তাঁকানোরও জোঁ নেই তাঁর। তাই ভুট্টু বুঝতে পারছে না যে কি অপেক্ষা ওর জন্য জানেনা ওর বাবার রুপ নিয়ে কে এসেছে ওরসাথে। এবার মানুষের চেহারা থেকে ভয়ানক দৈত্যের রুপ নিয়ে বিকট হাসি হাঁসলো ভূতটা; সব প্রস্তুতি শেষ এবার এক ধাক্কায় এতোদিনের পুষে রাখা রাগের সলিল সমাধি!! সব শেষ। এরপর শান্তি, শান্তি আর শান্তি। এবার ধাক্কাটা দেবার পালা। হঠাৎ প্রচন্ড রকম শব্দে ঘুরে তাকায় ভুট্টু আর যা দেখল তা দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না, দেখল পেছনে দাড়িয়ে আছে এক ভয়ানক বিশালাকার মূর্তি সারা গায়ে তার রক্তবর্ণ চোখে ভর্তি; চোখগুলো দিয়ে অর্নগল রক্ত পরছে। এরমধ্যে ভয়ংকর ভূতটা বিশাল হাত দিয়ে ভুট্টুকে ধরে ফেলেছে সে বুঝতে পেরেছে যে এবার তার জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে চোখ বন্ধ করে তাই আল্লাহকে ডাকতে থাকলো। ভূতটা তখন বিকট কন্ঠে বলছে ‘‘তোর বাপের হাতে পায়ে ধরছিলাম তাও শুনল না আমাকে ভূতচারা থেকে তাড়িয়ে দিলো কিইবা এমন করছিলাম আমি একটা না হয় বাচ্চাই খাইছিলাম। আজ তোকে মেরে প্রতিশোধ নিবো প্রতিশোধ।” 

কথা গুলো শুনে ভুট্টু চিন্তা করে পাচ্ছে না যে তাকে ভূতটা কিভাবে মারবে। হঠাৎ ই একটা ঝটকায় মাটিতে পরে গেলো ভুট্টু কিন্তু শুনতে পেলো পানিতে বড়ো কিছু পরার শব্দ। মানে ও বেঁচে আছে কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব। তাহলে পানিতে পড়ল কে? ভয়ে ভয়ে চোখ খুলল ভুট্টু মাটি থেকে অতিকষ্টে দাড়িয়ে দেখল বড়ো কুয়োটার পানিতে তখনো ব্যাপক ঢেউ হচ্ছে। কিন্তু ওটা কে? কুয়োর চারপাশে সাদা কাপড় পরা কে ওটা দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে দাগ কাটছে মাটিতে দিচ্ছে? আর ভাবতে পারছেনা ভুট্টু ভয়ে সে জড়সড় হয়ে যাচ্ছে সবকিছু ঘোলাটে মনে হচ্ছে। এসব কি হচ্ছে তার সাথে? সাদা কাপড় পড়া লোকটি ক্রমেই কাছে আসছে।

ভুট্টু প্রানভয়ে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই একটা ডাক কানে ভেসে আসল ওর ‘‘কোথা যাস মোজাহার?’’ ভুট্টুর ভালো নাম মোজাহার কিন্তু ওর দাদু ইউসুফ সোনার ছাড়া আর কেউই এ নামে ডাকত বা এখনো কেই ডাকে না কিন্তু দাদু কোথায় থেকে আাসবে দাদু তো দশ বছর আগেই মারা গেছে। থতমত খেয়ে দাড়িয়ে পড়ল ভুট্টু আবার শোনা গেল ডাকটা এবার আরো কাছে থেকে ‘‘মোজাহার ভয় পাস না দাদু? আমি রে আমি! 

তোর দাদু আর ভয় নেই যে তোকে মারতে এনেছিল এখানে ওকে আমি বন্দি করে রেখেছি এই পানিতে।’’ ভুট্টু কাঁধে স্পর্শ অনুভব করল চিরচেনা সেই স্পর্শ ভালবাসা মাখা আর ভয় নেই দাদু এসে গেছে। ভুট্টুর মনে পড়ল দাদুর কথা আজ থেকে দশ বছর আগে যখন তিনি মারা যান তখন ওকে ডেকে বলেছিলেন ‘‘দাদুভাই চলে যাচ্ছি এ দুনিয়া ছেড়ে কিন্তু আমি তোর পাশেই থাকবো।’’  দাদু ভুট্টুকে কোলে তুলে নিলেন। ভুট্টু অপলক তাকিয়ে রয়েছে দাদুর দিকে দাদুর চেহারা আগের মতো নেই এখন দাদু অনেক শক্ত সামর্থ্য যুবক। -তুমি কোথায় থাকো দাদু? ভুট্টুর প্রশ্ন।
-কেন দাদু এই যে, আমার বাড়ি।

এই বলে ভুট্টুকে ভূতচারার দিকে দেখিয়ে দিলো ওর দাদুু।
-ওমা একি এই বাড়ি কোথায় থেকে আসলো দিনের বেলা তো এখানে আমি অনেক খেলেছি।ভুট্টু সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল।

-হ্যাঁ দাদু এটা আমার বাড়ি এখানে আমি থাকি এখন থেকে তোমার যখন আমার কথা মনে হবে তুমি এখানে চলে এসো। প্রতিউত্তরে ইউসুফ সোনার।

-দাদু তোমাকে মারতে নিয়ে এসেছিল দাদু  ওই যে দ্যাখো একটা বাঁশের খুটি দেখছো ও এখন  ওইটার মধ্যে আছে। ভুট্টু পানিতে একটা কম্পনরত খুঁটি দেখলো। শাস্তি হবে, ওর বিরেুদ্ধে পরওনা জারি হয়েছে  ওর শাস্তি মৃত্যুদন্ড অনেক ক্ষতি করেছে আমাদের? ইউসুফ সোনার আরো বললেন।

হাতের ইশারায় পানি থেকে খুঁটিটা  শূন্যে ভাসতে ভাসতে তুলে আনলেন ইউসুফ সোনার এবার একটা চক্রে রেখে তুড়ি মেরে একটা দেশলাই বক্স নাতির হাতে দিলেন তিনি।
-দাদু মন দিয়ে শোনো আমি আগুনের কাছে থাকতে পারবোনা আমি দূরে দাড়িয়ে থাকছি তুমি এতে আগুন ধরিয়ে দাও বলে ইউসুফ সোনার নাতিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে দূরে গিয়ে দাড়ালেন । ইউসুফ সোনার দূরে দাড়ানোর পর ভুট্টু ভয়ে ভয়ে খুঁটির দিকে তাকায় ও দ্যাখে খুঁটি নড়ে উঠছে কথা বলছে ‘‘আমাকে মেরো না আমাকে মেরো না আমাকে ছেড়ে দাও’’  ভুট্টু এবার দাদুর দিকে তাকলো ‘‘দাদু ভয় পেয়ো না তাড়াতাড়ি করো এবার আগুন জ্বালিয়ে দাও’’ ইউসুফ সোনার বলল। ভুট্টু এবার ভয়ে ভয়ে একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে চক্রে ফেলল সাথে সাথে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। 

ভুট্টু দৌড় দিলো এক দৌড়ে দাদুর কাছে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল বিকট মরণ আর্তনাদ ভয়ে শঙ্কায় দাদুকে জড়িয়ে ধরল ভুট্টু।  ইউসুফ সোনার নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করে বললেন আমার যাবার সময় হয়ে উঠল দাদু, ‘‘চল তোমাকে রেখে আসি আর শোনো কাউকে বলো না আজ কি হয়েছিল। এখন দাদু চোখ বন্ধ করো তোমাকে তোমার ঘরে রেখে আসছি চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকবে ঘরে চিন্তা করো না  হাছির আজ আর আসবেনা মাছ ধরতে । যখন আমাকে মনে পড়বে চলে এসো আমার বাড়ি...!’’ সকালে যখন ঘুম ভাঙল ভুট্টু তখন নিজেকে ওর ঘরে আবিস্কার করল, অজানা এক সুগন্ধে ভরে আছে ঘরটা।