যৌতুক - ছোট গল্প


রাজু আর রানু ছোটবেলার খেলার সাথী মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজুর পরিবার ভারতে চলে যাওয়ায় রাজুকেও পরিবারের সাথে যেতে হয়। সেই ছাড়াছাড়ির প্রায় ১৫ বছরের। ছোট বেলাতে রাজু-রানুর বর-বউ খেলা দেখে রানু আর রাজুর মা ঠিক করেছিল ওদের দুজনের এই খেলাকে সত্যিকারে রুপ দেবে তারা। বরাবরই একত্রে থাকে থাকত ওরা রাজু যেখানে রানুও সেখানে। 

ছোটবেলায় একবার রাজুর সামনে রানুকে গাল টেনে আদর করেছিল এক প্রতিবেশী কিন্তু রাজু ভাবল তাঁর প্রাণ প্রিয় সাথীটিকে নিশ্চয় তিনি মারছে এই ভেবে কান্না শুরু করেদিল সে। রাজুকে কাঁদতে দেখে রানুও কাঁদতে আরম্ভ করল। প্রতিবেশীটি তো হতভম্ব কি হলো এটা হিতে বিপরীত। সেই রানু আজ অনেক বড় হয়ে গেছে রাজুর সামনে আসলেও আগের মতো করে কোন অনুভূতির প্রকাশ ঘটেনা কোন ভাবেই। রাজু অনেকবার চেষ্টা করেছে ওর সাথে কথা বলার কিন্তু বরাবরই রানু এড়িয়ে গিয়েছে। রাজুর আর সইছিল না তাই সে রানুর মায়ের কাছে ওর পরিবর্তনের কথা জানতে চাইলে। যার বুকটা কষ্টে ভরা তার তো হাঁসিতেও কষ্ট বাবা! খুব কষ্টে কথা গুলো বলছিলেন রানুর মা। 

কথাটার অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না রাজুর। মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর রাজুু প্রশ্ন করল কেন? এতো কষ্ট কিসের ওর? সে অনেক কথা বাবা পরে শুনবে এতটুকু না বলতেই রানুর মাকে থামিয়ে দিয়ে রাজু বলে উঠল না চাচী আজই শুনতে চাই প্লিজ বলুন। রানুর মা এবার শুরু করলেন কাহিনী শুনতে শুনতে রাজু ফিরে গেলো ১৫ বছর পূর্বে। তোমরা যখন ভারতে চলে যাও তখন রানু অনেক কেঁদেছিল। মাঝে মাঝেই আনমনে ওর মিনিকে আদর করে তুমি ফিরে আসবে তাই বলত। রানু ওর পোষা বিড়ালকে মিনি বলে ডাকে সে তো তোমার জানা আছে। ‘‘মিনি কোথায় চাচী’’ রাজুর প্রশ্ন। 

ডুঁকরে কেঁদে উঠলেন রানুর মা। কাঁদতে কাঁদতে বললেন মিনিই তো সব শেষ করল মেয়েটার। কেন? কি হয়েছিল চাচী? উৎকন্ঠা আবেগমিশ্রিত রাজুর প্রশ্ন। রানুর মা আবার বলতে শুরু করলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধে আমরা ভেবেছিলাম শহরেরই এর কিছু একটা সমাধান হবে কিন্তু হঠাৎ একদিন মিলেটারি ক্যাম্প এসে ঘাঁটি করল আজিমনগর মাদ্রাসাতে। ভয়ে আতঙ্কে সবার মন উদ্বিগ্ন। স্কুলসহ সকল প্রতিষ্ঠান একে একে বন্ধ হয়ে গেলো। কি হবে? কি হতে যাচ্ছে? কেও জানে না। স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো সবার। দল তৈরী হলো স¦স্বত্র। দলে নাম লেখালো এলাকার কুকুরেরা। মিলিটারিদের ফায়-ফরমাশ খাটতো ঐসব কুকুরেরা। বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তরুণ-যুবকদের নিয়ে গিয়ে মুক্তিবাহিনী বলে নির্বিচারে হত্যা শুরু করলো পিশাচেরা; যেন রক্ত পিপাসা কিছুতেই মিটছে পিশাচদের। কাউকেই রেহাই দেয়নি ওরা। 

রানুর বাবা আজ ওদের অত্যাচারে বিকলাঙ্গ। সেদিন রানু মিনিকে খুঁজতে বাড়ির বাহিরে বেড়িয়েছিল ঠিক তখন হানাদার সৈন্য আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রানুকে দেখে ওকে ধরে নিয়ে যায়। মিনিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে পিশাচের হাতে হতে হলো...। ছলছল চোখে ক্রোধে রাজু কেঁপে ওঠে বুক। নিজেকে প্রচন্ড স্বার্থপর মনে হচ্ছে রাজুর; ছিঃ ছিঃ এ ধিক্কার কার জন্য যাকে সে এতো ভালোবাসে তাঁকে বাঁচাতে পারলো না পিশাচদের হাত থেকে। তা আ আ র...পঅঅর! কম্পমান গলায় রাজুর প্রশ্ন। তারপর আর কি? সব শেষ। দিন যায় মাস যায় সময় একএকটাদিন ওর অপেক্ষায় থেকেছি কেউ খবর দিতে পারেনা। ভেবেছিলাম ওকে আমরা আর পাবোনা। কিন্তু একদিন মুক্তিবাহিনী মাদ্রাসা আক্রমণ করে ওকে উদ্ধার করে মুক্ত হয় এলাকা। যখন মুক্তিবাহিনী উদ্ধার করে তখন রানুর মুখে শেষ কথা ছিল ‘‘বাংলার মাটি কি এখন মুক্ত, কেউ কি আমাকে আর নির্যাতন করবে না তাহলে? আমরা কি মুক্ত? আমরা কি স্বাধীন?” তারপরই আজ পর্যন্ত করো সাথে কোন কথা বলেনি রানু। 

প্রাণচঞ্চল মেয়েটার চঞ্চলতা মাটিতে মিশে গেছে একাকার হয়ে। অনেকবার বিয়ে কথা বললে; রানু লিখে জানাত যে, একবার যাকে স্বামী বলে ভেবেছে তার জন্য সারা জীবন ধরে অপেক্ষা করতে হলেও সে অপেক্ষা করবে কিন্তু ™ি¦তীয় বিয়ে করবে না। তা বাবা রাজু তোমার মা কে নিয়ে এলে না যে। রানুর মায়ের দিকে তাকিয়ে কি বলবে খুজে পাচ্ছে না রাজু তবু খাবি খেয়ে খুব কষ্টে বলল। মা আর নেই। মা-বাবা কেউ নেই হানাদাররা সবাইকে মেরে ফেলেছে পথেই; সবাই জানে আমরা ভারতে আছি। পথে যেতেই হানাদারদের হাতে ধরা পরি আমরা চোখ বেঁধে আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পিশাচেরা। ঘটনাক্রমে আমি বেঁচে যাই যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তখন আমি ভারতের মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার রফিক ওই পথে ক্যাম্পে যাওয়ার সময় আমার কন্ঠ শুনে আমাকে সাথে করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেই থেকে শুরু হয় আমার দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ। এতক্ষণে রানু ঘরে প্রবেশ করলো। মিনি সহ মিনির সন্তানদের নিয়ে ঘরে আসা রানুকে কেনো জানি খুশি মনে হচ্ছে। 

যদিও রানুর মায়ের সাথে কথা বলার সময় একবার রাজুর মনে হয়েছিল যে রানু দরজার পাশে দাড়িয়ে আছে। যাহোক এবার অনেকক্ষণের পরে রানুর হাসি মাখা মুখটিতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য আর সবুজ প্রান্তে ছুটে চলা রানুর মধ্যে অন্তমিল খুঁজে পেল রাজু। তুমি কেমন আছো রানু? রানু ফিরে তাকালো রাজুর দিকে? কিছু বললো না সে। রাজু আবার প্রশ্ন করলো কি হলো বলবে না কেমন আছো? ‘‘তুমি এসেছো এখন আমি সারা জীবন ভালো থাকবো?’’ হঠাৎ রানু বলে উঠল।  রানুর মা আনন্দে আবারো কেঁদে ফেলল এতোক্ষণ কেঁদেছে বাঁধভাঙা কষ্টে কিন্তু এখন এ কান্না আনন্দের। আজ হ্যাঁ! হ্যা!ঁ আজই! 

এই বীরাঙ্গনার(রানুর) হাসিতে ঠিক এই মুহূর্তেই রানুর মা স্বাধীনতা ফিরে পাবার আনন্দ অনুভূত করছে। রানুর কথা শুনে বিকলাঙ্গ রানুর বাবা হামাগুড়ি দিতে দিতে পাশের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো। ‘‘এই তোরা দেখে যা রানু কথা বলেছে রানু কথা বলেছে’’ রানুর বাবার সাথে চিৎকার শুরু করে দিল রানুর মা। ততক্ষণে আশেপাশের প্রতিবেশীরা এসে উপস্থিত হয়েছে উঠোনে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সেই গাল টেনে আদর করেছিল সেই চাচাও আছে। রাজু এবার বিজ্ঞের মতো বলে উঠল চাচী আমার মা-বাবা নেই আপনারাই আমার মা-বাবা আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল আমাদের...। 

বলতেই না বলতেই প্রতিবেশীর কে একজন বলে উঠল সে জানি বাপু ‘‘বিয়ে কবে সেটা বলো? আর যৌতুক কিন্তু দেওয়া যাবে না কিন্ত?’’ এবার রাজু বলে উঠল ‘‘না যৌতুক তো নিবো আমি?’’ সবাই একসাথে বলে উঠল ‘কিইইই?’ রাজু বলল ‘যৌতুক ছাড়াতো বিয়ে করবো না আমি।’ একজন বলে ‘কি কও মিয়া! কি নিবা কও দেখি কি চাই তোমার?’ ‘তেমন কিছুনা যেটা ছাড়া আমার রানু চলতে পারে না।’ ‘কি মিয়া কি কও খোলাসা কওে কও’ জমায়েত থেকে কে একজন বলে উঠল। 

‘আমার যৌতুক হিসেবে মিনি পরিবারকে চাই যাদের ছাড়া রানু একমূহুর্ত থাকতে পারে না।’ নিমিষেই জমায়েতে হাসির রোল পড়ল। সবাই জানে রানুর পোষা বিড়ালের নাম মিনি। ভীড় ঠেলে এবার বৃদ্ধ চাচা ছোট্টবেলার সেই গালটেনে আদর করার ঘটনার পূনরাবৃতি করলেন দুজনের দুই গালে কিন্তু এবার আর কেউ কাঁদলো না কেননা ওরা জানে এর মানে কি !